মায়াময় এক সাদা বিল্ডিং

শেয়ার করুন

ফাইজাহ বিনতে ফরিদ।।

কলেজে পড়ার সময় তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের “সপ্তপদী” উপন্যাস পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম।কৃষ্ণেন্দু- রিনা ব্রাউন- ক্লেটনের অদ্ভুত সেই ত্রিভুজ মনে দাগ কেটেছিল তো বটেই, কিন্তু সবচেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম তখনকার সমাজে অচ্ছুৎপ্রায় কুষ্ঠরোগীদের প্রতি রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামীর নিখাদ সেই মমতার প্রকাশ দেখে।কে জানত,গত নভেম্বরে উত্তরবঙ্গ টুরের সময় নীলফামারী শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে গ্রামের এক কোণে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে একটুকরো সপ্তপদী আর ”পাগলা পাদ্রীর দল”!

বলছিলাম ” ডেনিশ বাংলাদেশ লেপ্রোসি মিশন হাসপাতাল” -এর কথা।আমার শৈশব বলতে গেলে হেলথ্ কমপ্লেক্সেই কেটেছে।রোগীকে সুস্থ করার জন্য চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা, সুস্থ রোগী বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় একজন চিকিৎসকের মুখের প্রশান্ত হাসি আর এই দুয়ের মাঝে সেই চিকিৎসক এবং তার পরিবারের সব স্যাক্রিফাইস দেখে দেখেই বড় হয়েছি।কিন্তুু লেপ্রোসী হাসপাতালের সেই আঙিনাতে গিয়ে চিরপরিচিত সেই অনুভূতি যেন নতুন হয়ে,আরও সতেজ হয়ে ফিরে এসেছিল।

আগেই বলে নিই,সেখানে আমরা কোন inspection team এর মেম্বারের সাথে যাইনি,বাবা তখন সাথে ছিলেন না, এমনকি মা প্রথমে তার চিকিৎসক পরিচয়টিও দেন নি।তাই সেখান থেকে নিজের চোখে দেখে আসা আন্তরিকতা যে শতভাগ নিখাদ ও নির্ভেজাল- তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

আমরা নিজেদের সভ্যতার স্বর্ণযুগের বাসিন্দা মনে করলেও কুষ্ঠ রোগীদের নিয়ে সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার কিন্তু এখনো সম্পূর্ণ মুছে যায়নি।চার দেয়ালের ছোট্ট সেই সাদা বিল্ডিংটিকে আমি কখনোই ভুলব না একটি কারণে, কারণ সেখানের মানুষজনেরা সারাজীবন আমাকে মনে করিয়ে দেবে, একজন চিকিৎসক হিসেবে শুধু রোগের চিকিৎসা করাই আমার দায়িত্ব না,সুস্থ হওয়ার পর মানুষটা যেন তার ফেলে আসা সেই সুন্দর- স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে,সেজন্য তার মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলাও আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

সেই হাসপাতালটিতে মূলত কুষ্ঠ রোগের ফলশ্রুতিতে হওয়া স্নায়ুরোগের চিকিৎসা করা হয়।হাত- পা অবশ হয়ে যাওয়া,স্পর্শ ইন্দ্রিয় নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।পাশাপাশি চিকিৎসা শেষে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী accessories যেমন-স্পেশাল সোলের জুতা ( যেহেতু স্পর্শ অনুভুতি না থাকায় তারা আঘাত বুঝতে পারেনা),কৃত্রিম পা এসবও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু রোগের চিকিৎসার চেয়েও বড় কথা, সেখানে জীবনের সব আনন্দ হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোকে নবোদ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সাহস যোগানো হয়।আমার হাত-পা আছে কিন্তু আমি সেগুলো দিয়ে কোন কাজ করতে পারছিনা,একটা মানুষের জীবনে এর চাইতে দুঃখের আর কি আছে! এই ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক শক্তিও কিন্তু ফিরে পাওয়া প্রয়োজন। ফিজিওথেরাপি দিয়ে হয়ত শারীরিক শক্তি ফিরিয়ে আনা যায়,কিন্তু যতক্ষণ না মানুষটাকে বলা হয়,’আমরা তোমাকে চিকিৎসা দিচ্ছি, কিন্তু তুমি কিন্তু সুস্থ হচ্ছ সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় তোমার নিজের মনের জোরে’ ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু তার আত্মবিশ্বাসটা ফিরে আসেনা। এই সাহস যোগানো,ভরসা দেওয়া, আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার কাজটাই করতে দেখেছি সেখানকার শ্রদ্ধেয় সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে।

মিথ্যা কথা তো চাইলেই বলা যায়,কিন্তু সেখানকার প্রতিটি রোগীর চোখে যেই গভীর আত্মবিশ্বাস আর প্রতিটি মেডিকেল পারসনের চোখে তাদেরকে সুস্থ দেখার যে প্রচণ্ড ইচ্ছা আমি দেখেছি, তা দেখার পর আমার বিশ্বাস কেউ আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন না।চোখ কি আর মিথ্যা বলে!

সবশেষে যখন বেরিয়ে আসছিলাম ফুলে ফুলে ছাওয়া সেই চত্বরটি ছেড়ে,করিডোরে হঠাৎ একজন অতিবৃদ্ধ মানুষের সাথে দেখা হল,হুইলচেয়ারে বসে শীতের মিষ্টি রোদ উপভোগ করছিলেন মনে হয়।আমার দাদাভাইও ওনার বয়সী,কেমন যেন কষ্ট লাগছিল তাই ওনাকে দেখে।ভাবলাম,কাছে গিয়ে বলি, চিন্তা করবেন না দাদু,আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন।কিন্তু ওনার চোখে চোখ পড়তেই বুঝে গেলাম আমার এই আশার বাণী ওনার খুব একটা প্রয়োজন নেই, এই চত্বর ওনার মাঝে ইতিমধ্যেই সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছে।তাই শেষমেষ ওনার দাঁতহীন মাড়ির হাসি আর মাস্কের আড়ালে চাপা পড়া আমার বত্রিশ দাঁত বের করা এক হাসিই হয়ে রইল নাম না জানা সেই দাদাভাইয়ের সাথে আমার প্রথম ও শেষ স্মৃতি!

মেডিকেলে পড়া ঠিক কেমন স্ট্রেসের একটা প্রফ দিয়ে ফেলার পর তা আর অজানা নয়।দেশ ছেড়ে যাওয়ার যেহেতু আপাতত কোন ইচ্ছে নেই,তাই অনাগত অনিবার্য ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার কথা ভাবা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই না।কিন্তু এরকম নিষ্পাপ হাসি আরও বহুবার দেখার ইচ্ছায় একটু কষ্ট তো করাই যায়, তাই না?

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *